কালিগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসক ও ঔষধ সংকটে রোগীদের চরম ভোগান্তি

হাফিজুর রহমান সাতক্ষীরা (কালিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৫(সোমবার)
ডাক্তার সংকট, এক্সরে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম, টেকনিশিয়ান,  ডেন্টাল যন্ত্রপাতিসহ নানান সংকট, অব্যবস্থাপনার মধ্যে ধুকে ধুকে চলছে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২ টি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে  ১ টি অকেজো হয়ে গ্যারেজের মধ্যে পড়ে আছে বাকি ১ টি দিয়ে কাজ চালাতে যেয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  যুগ যুগ পেরিয়ে গেলেও গাইনি, সার্জারি, ডেন্টাল, অর্থোপেডিক, নাক কান গলা ও চর্ম বিশেষজ্ঞ ,মেডিসিন, শিশু, চক্ষু, কার্ডিওলজিস্ট চিকিৎসক সহ আজ পর্যন্ত কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়ন না হওয়ায়  দারুন ভাবে ব্যাহত  হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। গর্ভবতী নারী, শিশু সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তদের দুর্ভোগ চরম ভাবে বেড়েই চলেছে। 

উপজেলার প্রায় ৩ লক্ষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবায় ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কালিগঞ্জ  উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।  প্রথমে ২০ শয্যায় হাসপাতালটি নানা সংকটে থাকার পর নতুন ভবন নির্মাণের ফলে ২০১০ সালের ২৪ ডিসেম্বর ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও দীর্ঘ ১৫ বছরে মেলেনি আকাঙ্ক্ষিত সেবা।  হাসপাতাল টিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক সহ আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে উপজেলা বাসীর। প্রতিদিন ২ থেকে ৪,শ রোগী সেবা নেন এই হাসপাতলে।  এই সমস্ত অব্যবস্থাপনা ও সংকটের কারণে সুফল পাচ্ছে না উপজেলাবাসী । হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এবং কমিশন বাণিজ্যের কারণে সরকারি নির্দেশনা কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিন সকাল ৮ টা হতে ২ টা পর্যন্ত বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রায় অর্ধশত রিপ্রেজেনটিভদের অত্যাচারে রোগীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে  দেখা গেছে হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশ করে ডাক্তারের চেম্বার এবং  ওষুধ বিতরণ কক্ষের সামনে ভিড় করা লাইনে দাড়ানো রোগীদের  কাছ থেকে জোরপূর্বক ব্যবস্থাপত্র ছিনিয়ে নিয়ে মোবাইলে ছবি তোলার জন্য  টানাটানি করতে থাকে। রোগীদের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র ছিনিয়ে নিয়ে মোবাইলে ছবি উঠানো এবং ধরে টানা হ্যাছড়া করতে গেলে রোগীরা অনেক সময় মার মুখী হয়ে ওঠে।বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাকে জানিয়ে ও কোন লাভ হয়নি। কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপজেলার ১২ টি ইউনিয়নের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র মিলে মোট ৩৪ জন ডাক্তারের চাহিদা পত্রে উল্লেখ আছে। এরমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা কমিউনিটি সেন্টারে ১২ জন থাকার কথা।

সরকারি নিয়ম-নীতি অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা, ১ জন জুনিয়র কন্সালটেড সার্জারি, ১জন জুনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট এনাস্তেসিয়া, ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ড গাইনি, ১ জন জুনিয়র কনসালটেড শিশু, ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থোপেডিক, ১ জন জুনিয়র কনসালটেড চর্ম ও যৌন, ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট চক্ষু, ১ জন জুনিয়র কনসালটেড ই, এন, টি,( নাক কান গলা), ১ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি, ১ জন (আর এম ও) অর্থাৎ আবাসিক  মেডিকেল অফিসার এবং সহকারি সার্জন হিসাবে ৫ জন ,মেডিকেলে অফিসার ৩ জন ডেন্টাল সার্জন, ১ জন হোমিও ইউনানী আয়ুর্বেদিক, ১ জন মিলিয়ে মোট ২২ জন ডাক্তার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকার কথা। বাকিরা ইউনিয়নের প্রথম শ্রেণীর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৪ জন এবং ইউনিয়ন সহকারী সার্জন হিসেবে ৮ জন মোট ১২ জনসহ সর্বমোট ৩৪ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়নের কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সব মিলিয়ে বর্তমান ৬ জন ডাক্তার হাসপাতালে দায়িত্ব  পালন করছে।

এর মধ্যে ডা: বুলবুল কবির উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে আছেন। হাসপাতালে জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থোপেডিকে ডা: গৌতম কুমার মুখার্জি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে বদলি, চর্ম ও যৌন বিষয়ে ডা: এ,এম মোসাদ্দেক হোসেন বর্তমানে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি এবং ডাঃ মারুফ হোসেন (আয়ুর্বেদিক) ঢাকা সাভার হাসপাতালে বদলি হয়ে কর্মরত আছে। এক্ষুনে হাসপাতালে যে ৬ জন দায়িত্ব পালন করছেন তার মধ্যে  স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ বুলবুল  কবির, মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডাঃ আজাদ উল হক রাসেল, ডাঃ রুপা রানী পাল ,ডাঃ মোহাম্মদএনামুল হক, ডাঃ মিঠুন কুমার বিশ্বাস এবং ডাঃ অঞ্জন কুমার চক্রবর্তী ।

তবে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসাবে বা আরএম ওর  দায়িত্ব কেও পালন করছেন না। কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন  উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র, চাম্পাফুল ইউনিয়ন ১০ শয্যা  হাসপাতাল, বাঁশতলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, কালিগঞ্জ সদর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন ডাক্তার না থাকায় বর্তমান সেখানে স্বাস্থ্য সহকারীরা প্রতিদিন দায় সারা চিকিৎসা সেবা দিয়ে দিন পার করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা দানের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় নির্মিত চাম্পাফুল ১০ শয্যা হাসপাতালে কোন ডাক্তার না থাকায় বকাটে এবং মাদকাসক্তদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

কোন সেবা ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারের লাখ, লাখ টাকার সরঞ্জাম পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
রবিবার সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে  কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স  গেলে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী রফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, সাখাওয়াত আলী, শ্রাবন্তী সরকার, সুশান্ত কর্মকার, মালতি রানী, বরকত উল্লাহ,মশিউর, দিপালী রানী, ছকিনা, কামরুল,, শাহাদাত হোসেন, মিজানুর রহমান, ভাদুড়ী বিবি সহ একাধিক ব্যক্তিরা সাংবাদিক দেখে এগিয়ে এসে বলেন আমাদের কপাল পোড়া,চশু্চল তৎকালীন ডা: রুহুল হক  স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকতে এই হাসপাতালটি ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নতি হলেও স্বাস্থ্য সেবার কোন উন্নতি হয়নি। আক্ষেপ করে তারা বলেন ডাক্তার নাই, নামমাত্র ঔষধ, এক্সরে মেশিন নষ্ট, আল্টাসোনাগ্রাম মেশিন নষ্ট, ডেন্টাল নাই শুধুমাত্র প্যাথলজি বিভাগ দিয়েই চলে হাসপাতালটি। সন্তান প্রসবের জন্য সিজার করতে বাইরে যেতে হয়, চোখ, কান, নাক, গলা, দাঁত, হাড় ভাঙ্গা, হার্টের অসুখের কোন ডাক্তার নাই সেবা নিতে ঢাকা, খুলনা, ভারতে দৌড়াতে হয়। এখানে জোর জবরদস্তি করে ডাক্তারদের বদলি করে এ হাসপাতালে আনলেও তারা আবার তদবির করে মফস্বল রেখে ঢাকা বা নিজ নিজ পছন্দের জায়গায় চলে যায়।

এখানে মাত্র ৩/৪ জন ডাক্তার আছে তারা প্রতিদিন ৩/৪শ রোগী দেখতে হিমশিম  খেতে হয়। হাসপাতালে নামমাত্র ঔষধ পাওয়া গেলেও প্রায় সব ঔষধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।  বিষ্ণুপুর গ্রামের দিনমজুর আঃ জব্বার বলেন আমি গরিব মানুষ ভ্যান চালিয়ে খাই যা আয় করি তা দিয়ে সংসারের ৭/৮ জনের খাওয়া জোটে । হঠাৎ করে আমার বাবার পেটে তীব্র ব্যাথা হলে তাকে কালিগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করি । ডাক্তার দেখেছেন কিন্তু কোন ঔষধ দেননি সবকিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে । হাসপাতালে খাবারের মান ও ভালো না ।

আক্ষেপ করে বলেন সরকারি হাসপাতালে যদি চিকিৎসা ও ঔষধ না পাই তাহলে আমরা কোথায় যাবো।  বাজার গ্রামের জোসনা খাতুন জানান আমার স্বামীর মেরুদন্ডের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করি । হাসপাতাল থেকে শুধু ডাইক্লোফেনাক  ব্যথার ট্যাবলেট ছাড়া বাকি ঔষধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের বড় স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে সব সময় পাওয়া যায় না তিনি প্রায় সময় বাইরে থাকেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান। 

বিষয়টি নিয়ে তাকে জানিয়ে ও কোন কাজ হয়নি। তারা আক্ষেপ করে আরও জানান বিভিন্ন সময়ে সরকারের বড় বড় পদে সাতক্ষীরার অনেক মন্ত্রী ,সচিবরা থাকলেও এলাকার কোন উন্নতি হয়নি। বর্তমান মন্ত্রী পরিষদের সচিব ডক্টর আব্দুর রশিদের বাড়ি কালীগঞ্জে হলেও তিনি এ বিষয়টি নিয়ে কখনো খোঁজ খবর বা ফিরেও তাকায়নি । উপরোক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য মন্ত্রী পরিষদ সচিবের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সচেতন উপজেলা বাসী ।

তিনি অধিকাংশ সময় ফিল্ড ওয়ার্কের নামে  ক্লিনিক পরিদর্শনের কাজে ব্যস্ত থাকেন।  হাসপাতালে রোগীদের খাওয়ার মান খুবই খারাপ বলে ভুক্তভোগীরা জানান। একই ঠিকাদার দিয়ে যুগ যুগ ধরে সরকারের বরাদ্দের টাকা লুটপাট হলেও রোগীদের খাবারের কোন উন্নতি হয়নি।এইভাবে তাদের অভিব্যক্তিগুলো এ প্রতিনিধির মাঝে তুলে ধরেন। হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায় একদিকে হাসপাতালের ভিতরে এবং এক্সরে রুমের দরজায় কুকুর ঘুমিয়ে পাহারা দিচ্ছে।

অন্যদিকে শত শত  রোগীদের সেবা দিতে গুটি কয়েক ডাক্তার হিমশিম খাচ্ছে। ওই সময় খোঁজ নিতে অফিস সহকারীর নিকট জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা স্যার বাহিরে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ভিজিট করতে গেছেন। পরে তার মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি আসতে দেরি হবে বলে  ২/৩ দিন পরে আসতে বলেন। মুঠোফোনে ডাক্তার সহ বিভিন্ন সংকটের বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি সিভিল সার্জনের  নিকট কথা বলতে বলেন। 

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালামের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন সারা বাংলাদেশে ডাক্তার সংকট একইভাবে আমার সদর হাসপাতালেও ডাক্তার সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে নতুন কিছু ডাক্তার পদায়ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে ।

হয়তো এই সময় আমরা কিছু ডাক্তার পাবো। আমি এ বিষয়ে একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে লিখিত ভাবে জানিও কোন কাজ হয়নি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন