“বন্দর বিদেশীদের দেয়া যাবে না”— ঢাবিতে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক 
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫(বৃহস্পতিবার)

“বাংলাদেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর কোনোভাবেই বিদেশীদের দেয়া যাবে না” - মর্মে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র নেতৃবৃন্দ। আজ ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ (বৃহস্পতিবার) সকাল ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজুতে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এমন বক্তব্য দেয়া হয়।

সমাবেশে স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র নেতৃবৃন্দ বলেন, দুর্নীতি দূর করা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বয়ান তুলে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের কৌশলগত প্রবেশপথ চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশীদের হাতে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, অথচ দেশের প্রায় সকল সেক্টরেই দুর্নীতি ও সক্ষমতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। তাহলে শুধু কেন চট্টগ্রাম পোর্টকেই বিদেশীদের হাতে দিতে এতো তাড়াহুড়া!
চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল এপিএম টার্মিনালস ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে কনসেশন/লিজে দেয়ার যে তাড়াহুড়া সরকার করছে সেখানে দুর্নীতিরোধ কিংবা সক্ষমতা বৃদ্ধির চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা ও ভারত ও ইজরাইলের স্বার্থই অধিক রয়েছে বলে আমরা মনে করছি। কারণ আরব আমিরাতের সাথে ইতিমধ্যেই ইজরাইল ‘আব্রাহাম এ্যাকর্ড’ চুক্তিতে সই করেছে। এরপর সেখানে ইন্ডিয়া ও আমেরিকাকে যুক্ত করে ‘ইন্দো-আব্রাহাম চুক্তি’ করেছে। এরপর ‘আইটুইউটু’ বা ইন্ডিয়া, ইজরাইল, আরব আমিরাত ও আমেরিকা” নতুন আরেকটি কৌশলগত জোট করেছে। যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের লজিস্টিক্স সাপোর্ট দিয়ে থাকে। এর বাইরে ভারত, আরব আমিরাত ও ইজরাইল মিলে ‘আইমেক” নামে একটি করিডর তৈরীর চেষ্টা করছে। যেই কারণে ডিপি ওয়ার্ল্ড ভারতের ৫টি বন্দর পরিচালনার পাশাপাশি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রন নিতে চায়। অতএব, এপিএম টার্মিনালস ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দর চলে গেলে এতে লাভবান হবে ভারত ও ইজরাইল। বিপরীতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরী ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকারের উচিত ছিল- দুর্নীতির উৎসগুলো বন্ধ করা। কাস্টমসকে দুর্নীতিমুক্ত করা ও অটোমেশন সিস্টেম চালু করা, বন্দরের রোডঘাট ঠিক করা, দেশীয় অপারেটিংয়ে ঘাটতি থাকলে পযাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া। প্রয়োজনে বিদেশী অপারেটর হায়ার করে নিয়ে আসা। তাহলে দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমেই বন্দরের সর্বোচ্চ পার্ফরমেন্স নিয়ে আসা সম্ভব হতো। কিন্তু এসব না করে বিদেশী অপাটেরদের হাতে বন্দর চলে গেলে বন্দরের জট কমবে না, দুর্নীতি দূর হবে না, পার্ফরমেন্স বৃদ্ধি পাবে না। শুধু শুধু দেশীয় অপারেটরকে বিদেশী কোম্পানীর চাকর বানানো হবে। এর বাইরে কিছুই হবে না! নিউমুরিং টার্মিনাল একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্রত্যাশার চেয়ে অধিক পরিমাণ পণ্য হ্যান্ডেরিংয়ের রেকর্ড করছেন দেশীয় অপারেটররাই। তাহলে কেন এটি বিদেশীদের হাতে দিতে হবে!

স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টির নেতৃবৃন্দ বলেন, ভবিষ্যতে এসব বিদেশী অপারেটর আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে! রাজনৈতিক ও সামরিক উদ্দেশ্যে বন্দরগুলো ব্যবহার হতে পারে! সুদানের মত বন্দর থেকে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদদাতা হয়ে উঠতে পারে! সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ইশারায় দেশে গৃহযুদ্ধ তৈরীর নীল-নকশা তৈরী ও ইন্ধনদাতা হয়ে উঠতে পারে! পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের সার্বভৌমত্বকে হুমকীর মুখে ফেলে দিতে পারে! এমনকি সুযোগ বুঝে দেশের মানচিত্র পরিবর্তনেরও দু:সাহসও দেখাতে পারে! এছাড়া সামরিক-অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি, দেশের স্পর্শকাতর তথ্য ভারত, ইজরাইল তথা বিদেশীদের কাছে পাচার করা এবং দেশের ক্রান্তিকালে চট্টগ্রাম বন্দর নামক রাষ্ট্রের টুটি চেপে ধরে বৈদেশিক আনুগত্যে বাধ্য করার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে বিদেশী অপারেটরগুলো! 
নেতৃবৃন্দ বলেন, ৯০ ভাগ আমদানী-রপ্তানিরর কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে দেশের প্রতিটি স্থান ও নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বন্দর বিদেশীদের হাতে চলে গেলে আমদানী-রপ্তানী থেকে আসা অর্থের বড় একটা অংশ বিদেশে চলে যাবে, যেটা এতোদিন দেশের রিজার্ভে যোগ হতো। ফলে, দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং আমাদের রিজার্ভের উপর চাপ পড়বে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হবে, বেকারত্ব বাড়বে ও স্থানীয় পরিচালন দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ট্যারিফ বাড়ানোয় নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সবশেষে, দেশীয় উদ্যোক্তা ও মালিকানা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা শ্রমিকে রূপান্তর হবে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান দেউলিয়াকরণের দিকে যাবে। জব তৈরীর নামে আফ্রিকার মত বিদেশীদের অনুগত এক কামলা শ্রেণীতে পরিণত হবে ভবীষ্যত প্রজন্ম। “মালিক হবে বিদেশী, কামলা হবে বাংলাদেশী”- এরকম অবস্থা দাঁড়াবে! 

অতএব, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে নিউমুরিং টার্মিনালের লিজ প্রক্রিয়া এবং লালদিয়ার চর ও পানগাও টার্মিনালের সাথে এপিএম টার্মিনালস ও মেডলগ এস এর সাথে করা চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। নইলে আরো বড় আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। ইনশায়াল্লাহ!

শতাধিক শিক্ষার্থীর মাঝে সমাবেশে বক্তব্য দেন ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’র আহ্বায়ক মুহম্মদ জিয়াউল হক, দপ্তর সদস্য সাইফুল ইসলাম, জুবায়েদুল ইসলাম শিহাব, জাবির বিন মাহবুব, আহমেদ রেজাসহ আরো অনেক শিক্ষার্থী। সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে টিএসসি থেকে শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন